শেখ ফজলুল করিম মারুফ, লেখক ও গবেষক
পাহাড়ের সংকটকে খ্রিষ্টান মিশনারি দিক থেকে দেখলে হবে না। এই সমস্যা পুরোপুরি রাজনৈতিক।
পাকিস্তান কোনপ্রকার রাজনৈতিক সমঝোতা ছাড়া পাহাড়ীদের ভূমি অধিগ্রহণ করে জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র করার পর থেকে সৃষ্ট গণ অসন্তোষ থেকে এই সংকটের সূচনা।
সেখানে সামরিক কঠোর পন্থা কোন সমাধান নয়। জিয়া- এরশাদ- খালেদা জিয়া সামরিকপন্থায় এই সন্ত্রাস দমন করতে গিয়ে প্রচুর সেনা হারিয়েছেন।
শান্তি চুক্তির আগের বছরগুলোতে পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে প্রায় প্রতিদিন হেলিকপ্টারে সৈন্যদের লাশ যেতো। সেসময় চট্টগ্রামের আকাশে হেলিকপ্টার উড়তে দেখলে মনে হতো, কার মা'র বুক খালি হয়ে গেলো! সৈনিকদের ম্যালেরিয়ায় মৃত্যুর সংখ্যাও কম ছিলো না।
শেখ হাসিনার উদ্যোগে শান্তিচুক্তি ছিল পাহাড়ে রক্তপাত কমাতে একটি গঠনতান্ত্রিক ও কার্যকর পদক্ষেপ। এই চুক্তির ফলে সন্ত্রাসীরা অস্ত্র সমর্পণ করে। পাহাড়ে পাহাড়ে নটরডেম-ঢাবি-চবির ছেলেমেয়েদের দেখা যায়। চাকুরীতে উপজাতিদের ব্যপক অংশগ্রহণ ঘটে। নির্মোহ দৃষ্টিতে গণতন্ত্রহরণ ও রাজনৈতিক খুন গুমের কলঙ্ক না থাকলে মুজিবতনয়া হাসিনা স্রেফ শান্তিচুক্তির জন্য নোবেল প্রাপ্য।
এই চুক্তি না হলে এটা একটা ত্রিদেশীয় রণক্ষেত্রে পরিণত হতো। শান্তিচুক্তি সঠিক পদক্ষেপ ছিলো,এর প্রমাণ চারদলীয় জোট এই চুক্তির ধারাবাহিকতা রক্ষা করেছে।
চট্টগ্রামের পার্বত্য অঞ্চল অত্যন্ত দুর্গম। এখানে যুদ্ধে গেলে সেটা হতো আফগানিস্তানের মত অন্তহীন।
এখানে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির বড় একটা গ্রুপ সন্তু লারমার নেতৃত্ব থেকে বের হয়ে উগ্রবাদ চালাচ্ছে। তাদের কাজ হচ্ছে এখন জনপ্রতিনিধিদের হত্যা, বাঙালি খুন,সন্ত্রাস চাঁদাবাজি।
স্থানীয় রাজনীতিকদের বিরুদ্ধে পেশীশক্তি হিসেবে এই বিচ্ছিন্নতাবাদী সশস্ত্র সন্ত্রাসী গ্রুপকে শেল্টার দেয়ার অভিযোগ আছে।
এই বিপথগামী গৌষ্ঠী পাহাড়ের উন্নয়নে প্রধান অন্তরায়। এরা শান্তিচুক্তি মানে না।
এদের দমন করা গেলেও নির্মূল সম্ভব হয় নি। কাজেই বলপ্রয়োগ করে পাহাড়ে শান্তি ফিরিয়ে আনা যাবে না।
তথায় দীর্ঘমেয়াদী সুপরিকল্পিত গুচ্ছ কর্মসূচি হাতে নেয়া জরুরী।
ওখানে প্রয়োজন যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন, অভ্যন্তরীন ও আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর স্থাপন, ঘনবসতিপূর্ণ লোকালয় সৃষ্টি, আন্তর্জাতিক মানের বেশ কিছু পর্যটনকেন্দ্র নির্মাণ, বাঁশ,কাঠ,পাহাড়ী ফল ও জুম ফসলের নায্যমূল্য নিশ্চিত, শিক্ষা,প্রযুক্তি, খেলাধুলা ও সংস্কৃতির বিকাশ,হোটেল রিসোর্ট ও বেসরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধি। এককথায় জীবন-জীবিকা-সভ্যতার জমজমাট মিলনকেন্দ্র গড়া।
একাজের অন্তরায় সন্ত্রাস। সন্ত্রাস দমনে পাহাড়ে রাজনৈতিক ঐক্য খুব জরুরী। সন্ত্রাস কে অস্ত্র দিয়ে নয়; সুষ্ঠ রাজনীতি দিয়ে মোকাবেলা করতে হবে।
বিএনপিকে যেমন শান্তিচুক্তির ব্যাপারে ইতিবাচক হতে হবে। অপরদিকে ঐ তিন জেলায় পাহাড়ের স্বার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তার স্বার্থে সংকীর্ণ দলীয় দাপট ছেড়ে আওয়ামী লীগের উচিত বিএনপিকে রাজনৈতিক স্পেস দেয়া।
পাহাড়ে খ্রিষ্টান মিশনারি তৎপরতা আছে। কিন্তু তার পাল্টা সমাধান এনজিও কর্মকাণ্ড,ওয়াজ মাহফিল,মাদ্রাসা মক্তব এবং ধর্মীয় দলগুলোর একসাথে কাজ করা।
পার্বত্য চট্টগ্রামে ১৬ লাখ মানুষের বসবাস। এই অঞ্চল বাংলাদেশের মোট ভূ-খণ্ডের ১০ শতাংশ হলেও সেখানে বাস করে দেশের মোট জনসংখ্যার মাত্র ১ শতাংশ!
এই জনমানব শূন্যতা সন্ত্রাসীদের এক ধরনের অভয়ারণ্য গড়ে দিয়েছে। সুতরাং সেখানে প্রথম কাজ হচ্ছে জীবনের কলকাকলি মুখর প্রাণের স্পন্দন সৃষ্টি করা। সেখানে প্রয়োজনীয় সংখ্যক মানুষের ঘনত্ব বৃদ্ধি করা প্রাধিকারভুক্ত জরুরী কাজ।
পাহাড় আবাদে সুষ্ঠ ভূমিবিন্যাস করে ভূমিহীনদের মাঝে সুষম বন্টন করা উচিত। বাংলাদেশের স্বাধীনতায় পাহাড়ী উপজাতিদের অংশগ্রহণ আছে। একশ্রেণীর সুশীল ও মতলববাজ বাম বিদেশের ক্রীড়নক হয়ে পাহাড়কে বাংলাদেশের চেয়ে আলাদা করে বয়ান দেয়। সেটেলারদের সংকট হিসেবে দেখায়। অথচ এটা হচ্ছে ভূমির সুষম বন্টন। পাহাড় যেমন সবার। গোটা বাংলাদেশটাও তেমনি পাহাড়ীদের। আমাদের সংবিধান যেই বসবাস ও মুভমেন্টের স্বাধীনতা দেয় তা সবার জন্য।
মানুষের প্রয়োজনীয় ঘনত্ব না থাকলে একটা অঞ্চল উন্নত হয় না।
কাজেই অন্যান্য অঞ্চলের মত জনমানুষের মুভমেন্ট বৃদ্ধির জন্য সেখানে কর্মসৃজন জরুরী। এজন্য পরিবেশবান্ধব গার্মেন্টস ফ্যাক্টরি এবং শ্রমঘন পরিবেশ সহনীয় শিল্পায়ন প্রয়োজন।
বান্দরবান খাগড়াছড়ি রাঙামাটি ভ্রমণকালে আমি সেখানকার পর্যটন শিল্পের অমিত সম্ভাবনা দেখে এসেছি।
পার্বত্য চট্টগ্রামে অন্তত 20 হাজার কোটি টাকার পর্যটন ও শিল্প বাজেট জরুরী। ডোমেস্টিক ও ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট খুব বেশী প্রয়োজন। দেশি-বিদেশি পর্যটকদের নিরাপত্তার জন্য সেনা নৌ বিমান বাহিনীর সমন্বয়ে বিশেষ "tourism security force (TSF)" গঠন করে সেনাক্যাম্প প্রত্যাহার করে নেয়া উচিত।
বেসরকারি বিনিয়োগের জন্য নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস,বিদ্যুত, টেলিকমিউনিকেশন ও সড়ক যোগাযোগ আবশ্যক।
উভয় তরফ থেকে শান্তিচুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়ন, কয়েক লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টি,৩ টি জেলা ভাগ করে ৯ টি করা, প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস এসব হাজার কোটি টাকার প্রকল্প ছাড়া সাময়িক কোন সমাধান পাহাড়ে শান্তি আনবে না। আমার আরেকটি ভাবনা হলো, জলবায়ু চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় উচ্চতর গবেষণার জন্য পাহাড়ে একটি বৃহত্তর Climate & Environment University প্রতিষ্ঠা করা।
বাজেট,উন্নয়ন, বিনিয়োগের আলো ছাড়া পাহাড় কখনো সন্ত্রাসমুক্ত হবে না।
পাহাড়ে খুন এখন নিত্য ঘটনা। প্রতিনিয়ত সেখানে খুন খারাবি হয়। তখন ইসলামপন্থীদের কোন প্রতিবাদ দেখা যায় না।
নবমুসলিম ওমর ফারুকের হত্যাকে নিয়ে ইসলামপন্থীরা মাঠ উত্তপ্ত করতে চাইছে। আমি এটাকে পাহাড়ের স্বাভাবিক সন্ত্রাসের চেয়ে আলাদা করে দেখছি না। তবে অবশ্যই একজন নিরীহ ইমাম হত্যার তদন্ত ও বিচার হতে হবে। এরজন্য রাজনৈতিক প্রেসার থাকা চাই। প্রয়োজনে নবমুসলিমদের সাহস দিতে চট্টগ্রাম শহর থেকে তিন জেলায় লংমার্চ হোক।
খ্রিষ্টান মিশনারি কনস্পাইরেসির কথা বলা হয়; এটা যদি সত্যি হয় সেটা খ্রিষ্টধর্মের মহান ধর্ম প্রচারকদের কারামত ও সাধনা।
এখানে সরকারের হস্তক্ষেপের কী আছে? ধর্মের দাওয়াত তো সবাই দিতে পারে।
শ্রদ্বেয় খালিদ স্যার সহ যেসব শিক্ষক-গবেষক পার্বত্য অঞ্চলে খৃষ্টান মিশনারী ষড়যন্ত্র নিয়ে বই পত্র লিখে থাকেন তাদের ক্ষেত্রে আমরা বিনয়ের সাথে জানতে চাইতে পারি, পাবলিক ফিগার ও প্রফেশনাল দাঈ হিসেবে তারা নিজেদের ছাত্রসমেত কয়দিন পাহাড়ে ইসলামের দাওয়াত দিতে গেছেন? দাওয়াতের দায়িত্ব ছেড়ে বসে বসে বইপত্র লিখলে আর সরকারের ঘাড়ে দায় চাপালে তাঁদের কাজ শেষ হয়ে যায় কি? ( মিশনারি গবেষক,বক্তা ও শিক্ষক হিসেবে এ কাজ করার আর্থিক,জনশক্তিগত সামর্থ্য তাঁদের আছে যা আমাদের নাই।)
ধর্মীয় বক্তারা দুর্গম পাহাড়ে বছরে কয়টা মাহফিল করেন?
পাহাড় তাবলিগ জামায়াতের বিশেষ গুরুত্ব পায় কিনা?
বায়তুশ শরফসহ অন্যান্য দরবার ও ট্রাস্ট সমূহ সেখানে সেবামূলক কি কাজ করে?
খালি মিশনারি মিশনারি না কপচিয়ে অধ্যাপক খালিদদের উচিত তাঁদের দুই-চারশো ছাত্র নিয়ে পাহাড়ে একমাস মিশনারি কাজ করা। বক্তাদের উচিত বছরে ৫০ শতাংশ মাহফিল সেখানে করা।
এসব দায় এড়িয়ে সরকার,খ্রিষ্টান মিশনারিকে অভিযুক্ত করার কোন অর্থ দেখি না।
খ্রীষ্টানদের অধিকার আছে তাদের ধর্মপ্রচারের। সেটা সেবা,প্রলোভন যেভাবেই হোক। আপনিও সেবা দেন, প্রলোভন দেন কেউ নিষেধ করে নাই।
পাহাড়ে উপজাতি-বাঙালি সবার রক্তপাত বন্ধ হোক। পাহাড়ে আলো আসুক।
পার্বত্য জেলাগুলোতে আমার একাধিক ভ্রমণ, তাদের জীবনযাত্রা পর্যবেক্ষন,পাহাড়ি-বাঙালি ছাত্রদের সাথে আলাপ ও গতানুগতিক প্রচলিত ডান-বাম বয়ানের বাইর থেকে একান্ত নির্মোহ বিশ্লেষণ থেকে আমার মন্তব্য হচ্ছে-
জীবনের বহুত্য,জীবিকার বৈচিত্র্য,উন্নয়নের কর্মযজ্ঞ, যোগাযোগের ব্যাপ্তি, শিক্ষার বিশ্বায়নই পহাড়ী শান্তির একমাত্র উপায়।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন